|
|
টোকিওতে অনন্য এক বৈশাখী আয়োজন
শ্যামল দত্ত, টোকিও থেকে ফিরে -
বৈশাখ আসলে বাঙালি জাগে। দেশে জাগে, বিদেশেও জাগে। লন্ডন থেকে লস এঞ্জেলেস, টোকিও থেকে সিডনি- বৈশাখ আসলেই সর্বত্রই বাঙালির সাজ সাজ রব। নানা বৈশাখী আয়োজনে মেতে উঠে প্রবাসী বাঙালি সমাজ। গত ২০ এপ্রিল এমন একটি অনন্য আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় টোকিওর ইকেবুকরো পার্কে। প্রাণবন্ত এই আয়োজনে বাঙালি-জাপানি মিলেমিশে একাকার নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠানে। সেই এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সুরে-তালে-লয়ে বাঙালির গান এসো হে বৈশাখ এসো হে এসো, সঙ্গে বাংলাপ্রেমী জাপানির আধো আধো উচ্চারণে তা আরো মোহনীয়। টোকিওর ইকেবুকরো পার্কটি নানা কারণে বিখ্যাত। বিদেশে সম্ভবত এটিই একমাত্র স্থান- যেখানে একটি একুশের শহীদ মিনার আছে। পাশ দিয়ে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়ে কোনো জাপানি নাগরিক। জানতে পারে বাংলাদেশ নামে এক দেশ আছে যেখানে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিল কিছু মানুষ। শ্রদ্ধায় নত হয় তারা। একুশের শহীদ এখন আর শুধু বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের স্মৃতি নয়, ছড়িয়ে গেছে বিশ্বের আনাচে কানাচে। একুশ এখন আনত্মর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বিশ্বজুড়ে এখন এই দিবসের প্রণোদনা। টোকিওর বুকে বাঙালির সংগ্রামের চিহ্ন ধারণ করে যে আলো জ্বলছে- তার কৃতিত্ব জাপান প্রবাসী সকল বাঙালির। একই সঙ্গে জাপানিদের কৃতিত্বও কম নয়। টোকিওর যে সিটিতে ইস্পাতের তৈরি দৃষ্টিনন্দন এই শহীদ মিনারটি স্থাপিত হয়েছে- তারা অনুমতি না দিলে তো এটা সম্ভবই ছিল না।
এই শহীদ মিনারের পাশেই শানবাঁধানো মাঠ যেখানে জাপান প্রবাসী সাত-আট হাজার বাঙালি সমবেত হয়েছিল নববর্ষ উদযাপনে। ২০ এপ্রিল রোববারের সকালটি ছিল আলোকোজজ্বল। যদিও এর আগের দিন বৃষ্টি হয়েছে। আয়োজকরা ছিলেন দুশ্চিন্তায়। খোলা মাঠে মেলা আর বর্ষ বরণের আয়োজন। বৃষ্টি হলে সব পণ্ড। কিন্তু সবার দুশ্চিনত্মাকে উড়িয়ে দেয় সকালের রোদ। সেই রোদ মেলার অংশগ্রহণকারীদের চোখে মুখে ছড়িয়ে দেয় আলোর বন্যা। সকালে এশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির সভাপতি ইয়োশিনারি কাতসুও ও আমাকে মঞ্চে ডাকা হয় মেলা উদ্বোধন করার জন্য। আমরা দুজন ফিতা কেটে মেলা উদ্বোধন করার সঙ্গে সঙ্গে সবাই সমবেত কণ্ঠে গেয়ে উঠে এসো হে বৈশাখ, এসো হে এসো। মুখরিত হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। এরপর শুরু হয় নানা অনুষ্ঠান। একদিকে চলছে গান, অন্যদিকে বাঙালি ও জাপানি শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। এরই মাঝে ছোটদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ছোট পুতুলের মতো জাপানি শিশুদের নাচ প্রজাপতি প্রজাপতি, কোথায় পেলে এমন রঙিন পাখা’। শাড়ি পরা বাঙালি পোশাকে জাপানি তরুণীদের নৃত্যানুষ্ঠান প্রমাণ করে দেয় অন্যের সংস্কৃতিকে নিজের করে নেওয়ার উদারতা তাদের কতোটুকু গভীর। এরপর অতিথি সম্মাননা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে আগত সাংবাদিক সাহিত্যিক আনিসুল হক, জাতীয় পতাকার ডিজাইনার শিব নারায়ণ দাশ ও আমাকে মঞ্চে ডেকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। নববর্ষের শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখি আমরা সবাই। এরপর নিপ্পনের পরিবেশনায় জাপানি লোকনৃত্য, হো উ কাই-এর পরিবেশনায় জাপানি গিটার এবং জাপানি ঢাক পরিবেশনা ছিল অনবদ্য। দুপুরে সাইক্লোন দুর্গতদের জন্য প্রেরিত বস্ত্র বিনামূল্যে বাংলাদেশে পৌঁছে দেওয়ায় মিৎসুবিসি লজিস্টিক করপোরেশন ও শিপিং কোম্পানি চে লাইনকে সম্মাননা জানানো হয়। এ সময় মঞ্চে প্রধান অতিথি ছিলেন জাপানের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী সংসদ সদস্য কোইকে ইউবিকো, জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আশরাফ-উদ-দৌলা, তোশিমা শহরের ডেপুটি মেয়র মাসাহিকো মিজুলিমা ও জাপান বাংলাদেশ সোসাইটির চেয়ারম্যান ড. ওসামু ওতসুবো। এ সমসত্ম অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দিনভর জাপান বাংলাদেশ সোসাইটির উদ্যোগে চলে শুধুমাত্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য বিনামূল্যে ¯^v¯’¨ পরীক্ষা। পরে বিকেলে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সেখানে জাপানের ¯^iwjwc কালচারাল একাডেমি ও উত্তরণ বাংলাদেশ কালচারাল গ্রুপের পরিবেশনায় বাংলা গানের অনুষ্ঠান। এরপর সন্ধ্যা না হওয়া পর্যনত্ম চলে এটিএন তারকা চুমকি আর ক্লোজআপ ওয়ান তারকা রিংকুর হৃদয়ছোঁয়া বেশকিছু লালনের গান। সন্ধ্যা নামতেই মেলার সমাপনী ঘোষণা দিলেন মেলা কমিটির প্রধান mgš^qK ড. শেখ আলীমুজ্জামান। সন্ধ্যায় মেলা শেষ, কিন্তু প্রাণের টানে মেলা প্রাঙ্গণে তখনো সমবেত সবাই। মেলা জুড়ে বই, কাপড়, কার্ডফোন, ক্যাসেট ও নানা রকমারি খাবার নিয়ে ছিল ৪২টি স্টল। ডালপুরি থেকে জিলেপি হালিম আর চটপটি- বাঙালির সব খাবারের সমাহার ছিল এসব স্টলে। প্রবাসী বাংলাদেশীর চাইতে জাপানি নাগরিকরা বেশি উপভোগ করেছে এসব খাবার। জাপানিদের খাবার সম্পর্কে আমাদের বাঙালি সমাজে নানা অভিমত। কিন্তু জাপানিদের খিচুরির সঙ্গে তন্দুরী চিকেন খাওয়ায় দৃশ্যটি ছিল উপভোগ্য। জাপান প্রবাসীদের সর্ববৃহৎ এই মিলন মেলার মূল আয়োজক জাপান-বাংলাদেশ সোসাইটি হলেও সকল প্রবাসীর দলমত নির্বিশেষে অংশগ্রহণে এটি হয়ে ওঠে একটি সবর্জনীন মেলা। বাংলাদেশে বৈশাখী আয়োজন যে সবর্জনীনতা পেয়েছে- প্রবাসেও এই আয়োজন তার ব্যতিক্রম নয়। এই কৃতিত্ব বৈশাখী মেলার mgš^qKe„‡›`i| প্রধান mgš^qK শেখ আলীমুজ্জামান এবং mgš^qKe„‡›`i মধ্যে নাসিম উস সালেহীন, সুখেন ব্রহ্ম, জাকির জোয়ার্দার, কাজী আসগার সানি, মাসুদুর রহমান, এ আর খান কামন, তানিয়া ইসলাম মিথুন, কে আসলাম হীরা, রাশিদুল ইসলাম, এ জেড এম জালাল, কামালউদ্দিন টুলু, জসিমউদ্দিন, মাসুম হাসান, হুসাইন মুনীর, বদর"ল বোরহান, বাদল চাকলাদার, আশফাকুজ্জামান খান, হারুমি উরেশ, রিৎসুকো কাবুতোমরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন মেলা সফল করতে। মেলার উপদেষ্টা সালেহ মোহাম্মদ আরিফ কিংবা জাপান বাংলাদেশ বিজনেস ফোরামের নেতা বিপ্লব মলিক, সাকুরা সাবের, বেলায়েত হোসেন লিটন, এম কে নান্নু, শামসুজ্জামান নয়ন, বাহাউদ্দিন বাহার কিংবা পি আর প্ল্যাসিড মেলার অতিথিদের স্পন্সর করে জাপান প্রবাসী বাংলাদেশীদের এই সর্ববৃহৎ মেলাকে করেছেন আরো সফল।
|
|
|
|
|
|